স্টাফ রিপোর্টার
একটি জনপদের রাজনৈতিক ইতিহাস কখনো শুধু একজন মানুষের গল্পে থেমে থাকে না। সময়ের সঙ্গে সেই ইতিহাস নতুন প্রজন্মের হাতে নতুন অর্থ পায়। বড়লেখা-জুড়ির রাজনৈতিক পরিসরেও যেন তেমনই একটি ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে—মরহুম জননেতা অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর পর তাঁর কন্যা ব্যারিস্টার জহরত আদিব চৌধুরীর জাতীয় রাজনীতিতে অভিষেক সেই ধারাবাহিকতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
তবে এই গল্প কেবল উত্তরাধিকারের নয়। রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এক বিষয়, আর শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা ও নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অবস্থান তৈরি করা আরেক বিষয়। জহরত আদিব চৌধুরীর বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে তাই পারিবারিক উত্তরাধিকারের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে আইন, করপোরেট নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক পরিসরের শিক্ষা।
২০২৬ সালের ১৩ জুলাই জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব অনুমোদনের পর সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপি সংসদ সদস্য জহরত আদিব চৌধুরী কমিটির সভাপতি হন।
এই দায়িত্ব তাঁকে সংসদীয় রাজনীতির এমন একটি জায়গায় নিয়ে এসেছে, যেখানে দেশের পররাষ্ট্রনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং বৈদেশিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে সংসদীয় পর্যায়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
দুই প্রজন্মের রাজনৈতিক পথচলা
বড়লেখা-জুড়ির মানুষের কাছে অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী ছিলেন পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততা এই অঞ্চলের মানুষের প্রতিনিধিত্বকে সংসদের বৃহত্তর পরিসরে দৃশ্যমান করেছিল।
সেই পরিবারেরই পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিনিধি জহরত আদিব চৌধুরী। তবে তাঁর পথচলা কেবল পিতার পরিচয়ের পুনরাবৃত্তি নয়। আইন ও করপোরেট জগতের অভিজ্ঞতা অর্জনের পর তিনি রাজনীতিতে এসেছেন এবং বর্তমানে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর পেশাগত পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো আইন ও করপোরেট নেতৃত্বের সমন্বয়। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদনে তাঁকে বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের শীর্ষ পর্যায়ের করপোরেট নির্বাহী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ রাজনীতিতে আসার আগে তাঁর পেশাগত পরিসর ছিল ভিন্ন—আদালত, ব্যবসা ও করপোরেট ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা তাঁকে তৈরি করেছে অন্য এক পরিসরে। রাজনীতিতে এসে সেই অভিজ্ঞতাই এখন সংসদীয় দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষায় তৈরি বিস্তৃত পরিসর
জহরত আদিব চৌধুরীর শিক্ষাজীবনও দেশের গণ্ডির বাইরে বিস্তৃত।
প্রকাশিত জীবনীসংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি যুক্তরাজ্যের Lincoln’s Inn থেকে Bar-at-Law সম্পন্ন করেছেন। যুক্তরাজ্যের University of Derby থেকে Commercial Law-এ LLM এবং Harvard Business School থেকে Senior Executive Leadership Program সম্পন্ন করার তথ্যও বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া যায়। পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের IBA থেকে Advanced Certificate in Business Administration অর্জনের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
আইন, ব্যবসায়িক ব্যবস্থাপনা ও নেতৃত্ব—এই তিন ভিন্ন ক্ষেত্রের শিক্ষার সমন্বয় তাঁর পেশাগত পরিচয়কে বহুমাত্রিক করেছে। আর বর্তমানে তিনি যে সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন, তার কাজের ক্ষেত্রও স্বভাবতই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বাইরে আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত।
পররাষ্ট্র কমিটির নেতৃত্ব: দায়িত্বের পরিসরও বড়
জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম নিয়ে সংসদীয় পর্যায়ে কাজ করে। ফলে এই কমিটির নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, কূটনীতি এবং বিদেশে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়।
জহরত আদিব চৌধুরীর দায়িত্ব নেওয়ার পর কমিটির কার্যক্রম ঘিরে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা সামনে এসেছে। এর মধ্যে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে ‘শিক্ষা কূটনীতি’ জোরদার এবং নারী শ্রমিকদের জন্য জরুরি হটলাইন চালুর মতো বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
সেপ্টেম্বরেও কমিটিটি পুনর্গঠনের পর তাঁকে সভাপতি হিসেবে রাখার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এতে স্পষ্ট যে দায়িত্বটি সাময়িক কোনো আনুষ্ঠানিক পদ নয়; বরং সংসদীয় কাঠামোর মধ্যে পররাষ্ট্রবিষয়ক নীতিনির্ধারণ ও তদারকির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
নিউইয়র্কের দিকে নজর, কূটনীতির নতুন প্রেক্ষাপট
এই সময়টিই আবার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক যাওয়ার কথা জানিয়েছেন সরকারি সূত্র ও সংবাদমাধ্যম। ২৪ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে তাঁর ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। সেখানে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বৈশ্বিক অর্থনীতি, জলবায়ু, অভিবাসন, শান্তি ও নিরাপত্তাসহ নানা আন্তর্জাতিক ইস্যুতে দেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ থাকে।
এই বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্রবিষয়ক স্থায়ী কমিটির নেতৃত্বও নতুন করে আলোচনায় আসা স্বাভাবিক। আর সেই কমিটির সভাপতি হিসেবে জহরত আদিব চৌধুরীর সামনে রয়েছে সংসদীয় পর্যায়ে পররাষ্ট্রনীতির নানা বিষয় নিয়ে কাজ করার সুযোগ।
বড়লেখা-জুড়ির মানুষের আগ্রহের জায়গাটিও এখানেই—স্থানীয় একটি রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি কীভাবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরের দায়িত্ব সামলান, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বাবার ছায়া নয়, নিজের পরিচয়ের সন্ধান
রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অনেক সময় যেমন শক্তি, তেমনি তা একটি বড় প্রত্যাশারও নাম। একজন প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকের সন্তান হিসেবে জনপরিসরে প্রবেশ করলে মানুষের প্রত্যাশা থাকে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের একটি যোগসূত্র তৈরি হবে।
জহরত আদিব চৌধুরীর ক্ষেত্রেও সেই প্রত্যাশা রয়েছে। কিন্তু তাঁর পরিচয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—রাজনীতিতে আসার আগে তিনি আইন ও করপোরেট জগতে নিজের পেশাগত অবস্থান তৈরি করেছেন।
তাই তাঁকে শুধু ‘এবাদুর রহমান চৌধুরীর কন্যা’ পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করলে তাঁর বর্তমান পেশাগত ও রাজনৈতিক যাত্রার একটি বড় অংশই আড়ালে থেকে যায়।
বরং বলা যায়, বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার তাঁর জন্য একটি ঐতিহাসিক পটভূমি তৈরি করেছে; আর শিক্ষা ও পেশাগত অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে নিজের পরিচয়ের ভিত্তি।
একটি জনপদের প্রত্যাশা
বড়লেখা-জুড়ির সঙ্গে তাঁর পারিবারিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে তাঁর প্রতিটি নতুন দায়িত্ব স্থানীয় মানুষের কাছেও আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
একসময় যে জনপদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব জাতীয় সংসদে তুলে ধরেছিলেন তাঁর বাবা, সেই একই জনপদের নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি এখন দেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক সংসদীয় কমিটির নেতৃত্বে।
এই যাত্রাকে তাই শুধু পারিবারিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের গল্প হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। এর মধ্যে আছে একটি জনপদের রাজনৈতিক স্মৃতি, একজন নারীর পেশাগত উত্থান, আন্তর্জাতিক শিক্ষার অভিজ্ঞতা এবং জাতীয় সংসদে নতুন দায়িত্ব পাওয়ার গল্প।
এখন সামনে মূল প্রশ্ন—এই অভিজ্ঞতা ও দায়িত্বকে তিনি কীভাবে কাজে লাগান। কারণ পদটি যেমন সম্মানের, তেমনি এর সঙ্গে রয়েছে নীতি, কূটনীতি ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কাজ করার দায়িত্ব।
বড়লেখা-জুড়ির মানুষের কাছে তাই জহরত আদিব চৌধুরীর নতুন অধ্যায় শুধু পরিবারের গৌরবের নয়; এটি তাঁদের নিজেদের জনপদের জাতীয় পরিসরে নতুন করে দৃশ্যমান হওয়ার গল্পও।
