রাজনীতির উত্তরাধিকার একজন মানুষকে পরিচিতি দিতে পারে, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতা, মেধা ও পেশাগত সক্ষমতার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে পরিচিত একটি পরিবারের সদস্য ব্যারিস্টার জায়মা রহমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনা তাই নতুন করে একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে—আমরা কি একজন মানুষকে তাঁর নিজের অর্জনে মূল্যায়ন করতে পারি, নাকি পারিবারিক পরিচয়ই আমাদের বিচার-বিশ্লেষণের প্রধান মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়?
জায়মা রহমানের দাদা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, দাদি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, বাবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মা চিকিৎসক ডা. জুবাইদা রহমান। এমন একটি পরিবারের সদস্যকে নিয়ে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যম, রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষের আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই আগ্রহের আড়ালে তাঁর নিজস্ব পরিচয়, শিক্ষাগত প্রস্তুতি ও পেশাগত অর্জন যেন হারিয়ে না যায়।
লন্ডনের কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিষয়ে পড়াশোনা এবং যুক্তরাজ্যে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন জায়মা রহমানের ব্যক্তিগত শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দপ্তরে তাঁর লিগ্যাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এখানে আবেগ কিংবা রাজনৈতিক পক্ষপাত নয়, প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন।
জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে কোনো পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পদের যোগ্যতা, নিয়োগবিধি, অভিজ্ঞতা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ। জায়মা রহমানের নিয়োগ নিয়েও কারও প্রশ্ন থাকলে তা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তোলা যেতে পারে। নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি যেমন যৌক্তিক, তেমনি প্রমাণ ছাড়া কাউকে অযোগ্য কিংবা বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করাও দায়িত্বশীল আচরণ নয়।
একটি বিষয় আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন—পারিবারিক পরিচয় কাউকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ্য করে না, আবার সেই পরিচয় কাউকে অযোগ্যও প্রমাণ করে না। একজন মানুষের অর্জনকে বিচার করতে হলে তাঁর শিক্ষা, দক্ষতা, পেশাগত প্রস্তুতি ও কাজের সক্ষমতা বিবেচনায় নিতে হবে। একই সঙ্গে যেকোনো নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়মের যথাযথ প্রয়োগ হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও সমান গুরুত্ব পাবে।
আমাদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, পরিচিত রাজনৈতিক পরিবারের কেউ সাফল্য অর্জন করলে এক পক্ষ সেটিকে অন্ধভাবে সমর্থন করে, অন্য পক্ষ আবার তাঁর সব অর্জনকে পারিবারিক প্রভাবের ফল বলে উড়িয়ে দেয়। এই দুই প্রবণতাই ন্যায়সংগত মূল্যায়নের পথে বাধা। রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তির পেশাগত অর্জন বিচার করার ক্ষেত্রে তথ্য ও যুক্তিই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
জায়মা রহমানকে নিয়ে আলোচনা হোক, তাঁর কাজের সমালোচনা হোক, তাঁর দায়িত্ব পালনের সক্ষমতাও মূল্যায়িত হোক। তবে সেই মূল্যায়ন যেন রাজনৈতিক বিদ্বেষ কিংবা অন্ধ আনুগত্যের শিকার না হয়। তিনি কী কাজ করছেন, কীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাঁর পেশাগত অবদান কী—এসব প্রশ্নের উত্তরই হওয়া উচিত আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
আমার বক্তব্য পরিষ্কার—পরিবারের পরিচয় কারও সাফল্যের একমাত্র ব্যাখ্যা হতে পারে না, আবার যোগ্যতার প্রশ্নেও কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রশংসা ও সমালোচনা—দুটিই হতে হবে যুক্তিনির্ভর, তথ্যসমর্থিত ও নিরপেক্ষ।
ব্যারিস্টার জায়মা রহমানের ক্ষেত্রেও সেই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য। তাঁকে মূল্যায়ন করা হোক তাঁর নিজস্ব পরিচয়, মেধা, পেশাগত দক্ষতা ও কাজের ভিত্তিতে। কারণ, শেষ পর্যন্ত একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় শুধু তিনি কোন পরিবারে জন্মেছেন, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; তিনি নিজের যোগ্যতা ও কর্মের মাধ্যমে কী অর্জন করেছেন, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
