নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে ৮৩৪ শহীদের নামসংবলিত ৯০ ফুট উচ্চতার স্মৃতিস্তম্ভ উদ্বোধন; আধুনিকায়নকৃত উদ্যানেও নতুন রূপ
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাজধানীর নাগরিক পরিবেশ উন্নয়নের লক্ষ্যে রাজধানীর ওসমানী উদ্যানে নির্মিত ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’ উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই অনুষ্ঠানে তিনি আধুনিকায়নকৃত ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানেরও উদ্বোধন করেন।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) সকাল ১০টায় প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছান। পরে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের বাবা মো. মকবুল হোসেন, মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধের বাবা মোস্তাফিজুর রহমান, শহীদ শাহারিয়ার খাঁন আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং শহীদ ওয়াসিম আকরামের বাবা মোহাম্মদ শফিউল আলমকে সঙ্গে নিয়ে তিনি স্মৃতিস্তম্ভটির উদ্বোধন করেন।
উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী স্মৃতিস্তম্ভ প্রাঙ্গণে একটি গাছের চারা রোপণ করেন। এরপর তিনি আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যান ঘুরে দেখেন এবং সেখানে স্থাপিত গ্রন্থাগার পরিদর্শন করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুস সালাম এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
৮৩৪ শহীদের নাম খোদাই করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভে
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি চিরস্মরণীয় করে রাখতে প্রায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে ৯০ ফুট উঁচু ‘জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ’। স্মৃতিস্তম্ভটির গায়ে লেজার কাটিং প্রযুক্তিতে খোদাই করা হয়েছে ৮৩৪ জন শহীদের নাম। এর সামনে স্থাপন করা হয়েছে ২০টি প্রতীকী সমাধিফলক।
স্মৃতিস্তম্ভের বাইরের দিকে ১৬৩ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে চার ফুট উঁচু এবং ভেতরের দিকে ১৭১ ফুট দীর্ঘ ও সাড়ে সাত ফুট উঁচু রিলিফ ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়েছে।
এসব ভাস্কর্যে বাংলাদেশের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। এতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন ঐতিহাসিক অধ্যায় স্থান পেয়েছে।
স্মৃতিস্তম্ভটি দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইতিহাস তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে।
সবুজ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে ওসমানী উদ্যান
রাজধানীর পুরান ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থলে অবস্থিত ২৩ একর আয়তনের ঐতিহাসিক ওসমানী উদ্যানকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে নতুন রূপ দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় উদ্যানটিকে সবুজ, নিরাপদ ও আধুনিক নাগরিক বিনোদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে।
আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে উদ্যানের পুরোনো জলাশয় সংস্কারের পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে পাঁচটি নতুন জলাশয়। বিদ্যমান গাছপালা সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন বৃক্ষরোপণ ও সবুজ দ্বীপ তৈরি করা হয়েছে।
উদ্যানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ হাঁটার পথ, ব্যায়ামাগার, প্যাগোডা, গণশৌচাগার, পার্কিং সুবিধা এবং জলাশয়ের ঘাট। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য রাখা হয়েছে ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ব্যবস্থা।
দুই স্তরে সাজানো উদ্যানটির সড়ক থেকে প্রায় দুই মিটার উঁচুতে রয়েছে দ্রুত চলাচলের পথ। এসব অবকাঠামোর মাধ্যমে নাগরিকদের হাঁটাচলা, শরীরচর্চা ও অবসর কাটানোর সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
নাগরিক সুবিধা ও ইতিহাস সংরক্ষণে নতুন সংযোজন
জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ এবং ওসমানী উদ্যানের আধুনিকায়ন—দুটি প্রকল্পই রাজধানীর নাগরিক জীবনে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগ, অন্যদিকে নগরবাসীর জন্য সবুজ ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা—এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
স্মৃতিস্তম্ভটি দেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস ও আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি আধুনিকায়নকৃত ওসমানী উদ্যান রাজধানীর মানুষের জন্য বিনোদন, শরীরচর্চা ও অবসরযাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক পরিসর হয়ে উঠবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
