নবীগঞ্জ উপজেলা খাদ্য গুদামে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। তালিকাভুক্ত কৃষকদের দাবি, নানা অজুহাতে তাদের কাছ থেকে ধান গ্রহণ করা হচ্ছে না। ফলে বারবার গুদামে গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। অন্যদিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভোরবেলায় অজ্ঞাত উৎসের ধানবাহী যানবাহন নিয়মিত খাদ্য গুদামে প্রবেশ করছে। অভিযোগ রয়েছে, খাদ্য গুদামের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে একাধিক সিন্ডিকেট সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান সংগ্রহের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কথা খাদ্য বিভাগের। মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেট মুক্তভাবে ধান সংগ্রহই এ কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য। তবে নবীগঞ্জ খাদ্য গুদামের বাস্তব চিত্র সেই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা। অনুসন্ধানে দেখা যায়, দক্ষিণ গজনাইপুর গ্রামের কৃষক ফরিদ মিয়া প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূর থেকে সরকারি মূল্যে ধান বিক্রি করতে খাদ্য গুদামে আসেন। কিন্তু গুদামে এসে প্রধান ফটক বন্ধ দেখতে পান। তার অভিযোগ, একই কারণে চারবার গুদামে এসেও ধান জমা দিতে পারেননি। শুধু ফরিদ মিয়াই নন, তালিকাভুক্ত কৃষক সাহেল মিয়া, আমীর আলী, রফিক মিয়াসহ আরও কয়েকজন কৃষক একই অভিযোগ করেন। তাদের দাবি, পরিবহন খরচ করে দূর-দূরান্ত থেকে এলেও ধান জমা দেওয়ার সুযোগ মিলছে না। সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল ৯টার পর সরকারি অফিস কার্যক্রম শুরু হলেও খাদ্য গুদামের প্রধান ফটক বন্ধ ছিল। তবে ফটকের বাইরে কৃষকরা অপেক্ষা করলেও ভেতরে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান ছিল। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ধান সংগ্রহের ক্ষেত্রে আর্দ্রতার সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১৪ শতাংশ। কিন্তু অনুসন্ধানকালে আর্দ্রতা মিটার পরীক্ষা করে প্রায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ আর্দ্রতার ধানও গ্রহণ করতে দেখা যায়। এতে সরকারি নীতিমালা অনুসরণের বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এছাড়া অফিস চলাকালে তালিকাভুক্ত কৃষকদের বাইরে অন্য ব্যক্তিদেরও খাদ্য গুদামের ভেতরে অবাধে চলাফেরা করতে দেখা যায়। কৃষকদের অভিযোগ, শুধু তালিকাভুক্ত হলেই ধান জমা দেওয়া যায় না; রাজনৈতিক প্রভাব বা সংশ্লিষ্ট সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগাযোগ না থাকলে সরকারি গুদামে ধান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, খাদ্য পরিদর্শক নীল রতন রায়, নিরাপত্তা প্রহরী কাশেম মিয়া এবং গুদাম সর্দার আব্বাস উদ্দিনের সহযোগিতায় একাধিক চক্র ভোরবেলা লোকচক্ষুর আড়ালে ধান সরবরাহ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে গুদাম সর্দার আব্বাস উদ্দিনের একটি ব্যক্তিগত খাতায় ১৩টি সিন্ডিকেটভুক্ত ৩২ জনের নামের তালিকা পাওয়া যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তালিকাভুক্ত অধিকাংশ ব্যক্তি রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে খাদ্য গুদামের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, গত ৭ জুন সকাল ৭টার কিছু পরে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশায় খাদ্য গোদাম এলাকায় আসেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব। পরে হাবিব খাদ্য গোদামের ভিতরে প্রবেশ করেন। কিচ্ছুক্ষণ পর নবীগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মিজানুর রহমান শামীমসহ কয়েকজন ব্যক্তি খাদ্য গুদামে প্রবেশ করেন। এরপর সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে প্রধান ফটক খুলে দেওয়া হলে নিরাপত্তা প্রহরী কাশেম মিয়ার উপস্থিতিতে দুটি পিকআপ ভ্যান গুদামে প্রবেশ করে এবং ধান খালাস করা হয়। একইভাবে ১৪ জুন সকাল ৭টায় নবীগঞ্জ পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহিবুর রহমানকে খাদ্য গুদামে প্রবেশ করতে দেখা যায়। পরে সকাল ৭টা ২২ মিনিটে প্রধান ফটক খুলে ট্রাক্টরে করে আনা ধান গুদামে প্রবেশ করানো হয়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, আর্দ্রতার মান যথাযথভাবে যাচাই ছাড়াই ওই ধান গ্রহণ করা হয়।
১৫ জুনও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সকাল ৬টা ৩৬ মিনিটে প্রধান ফটক খোলার পর ট্রাক্টরে করে ধান গুদামে প্রবেশ করে এবং তা গ্রহণ করা হয়। অভিযোগ প্রসঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক ও ছাত্রদল নেতা হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন- সকালে শারীরিক চর্চার অংশ হিসেবে খাদ্য গোদাম এলাকায় গিয়েছিলাম অন্য কিছু নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে খাদ্য গুদামের খাদ্য পরিদর্শক নীল রতন রায় প্রথমে অফিস সময়ের বাইরে ধান গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজ দেখানোর পর তিনি বলেন, অনেক সময় কৃষকের আত্মীয়স্বজন ধান নিয়ে আসেন এবং পরে কৃষি কার্ড নিয়ে উপস্থিত হন। তবে ভোরবেলায় কারা ধান সরবরাহ করছে এবং কীভাবে তা গ্রহণ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গুদামে ধান প্রবেশ নিয়ে তার কাছেও সমঝোতার প্রস্তাব এসেছিল। তবে তিনি তাতে সাড়া দেননি। তিনি জানান, সরকারি বিধি অনুযায়ী অফিস সময়ের বাইরে খাদ্য গুদামে ধান গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সরকারের উদ্দেশ্য ছিল কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কিনে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু নবীগঞ্জ খাদ্য গুদামের চিত্র বলছে ভিন্ন কথা। একদিকে তালিকাভুক্ত কৃষকরা দিনের পর দিন গুদামের ফটকের বাইরে অপেক্ষা করছেন, অন্যদিকে ভোরবেলায় লোকচক্ষুর আড়ালে গুদামে প্রবেশ করছে ধানবাহী যানবাহন। ফলে প্রশ্ন উঠেছে যেসব কৃষক ধান জমা দিতে পারছেন না, তাদের নামে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করছে কারা এবং কারা সেই সুযোগ করে দিচ্ছে ? এ প্রশ্নের উত্তর জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্তের অপেক্ষায় স্থানীয় কৃষক সমাজ।